লাবনী—একটি নীরব ভালোবাসার গল্প

A romantic couple by the riverside inspired by the story One Name One Lifetime
কিছু সম্পর্ক শেষ হয়েও শেষ হয় না— অনুভূতি আজীবন থেকে যায়। লাবনী—একটি নীরব ভালোবাসার গল্প; এক অন্তহীন স্মৃতিময় আখ্যান। চোখের আড়ালে চলে গেছে—তবু হৃদয় জুড়ে আজো সে অম্লান।

বি: দ্র: এই লেখায় ব্যবহৃত সব ছবি AI দিয়ে তৈরি এবং চরিত্রের নামসমূহ কাল্পনিক। বাস্তব কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্য কেবলই কাকতালীয়।

লাবনী—একটি নীরব ভালোবাসার গল্প

-এস, এম, মনিরুজ্জামান 

শ্রাবণের দিন ছিল সেদিন। বিকেলের আকাশে মেঘ জমেছিল, কিন্তু বৃষ্টি নামেনি।
হাওয়া ভারী, চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা—যেন কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায়।

আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। অনেক দূরে তাকিয়ে—কিছু একটা দেখছিলাম, আবার হয়তো কিছুই না।

হঠাৎ খেয়াল করলাম—সামনে, কিছুটা দূরে, দুইটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। না, শুধু তাকিয়ে না—বরং আমাকে নিয়েই যেন হাসছে।

মুহূর্তেই অস্বস্তি হলো। বুঝতে পারলাম, তারা হয়তো ভাবছে আমি তাদের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম।

ছোটবেলা থেকেই আমি একটু লাজুক। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
চুপচাপ সরে গেলাম।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—সেদিনের ঘটনাটা সেখানেই শেষ হয়নি।

এরপর প্রায়ই দেখা হতে লাগল আমাদের।
প্রথমে মনে হয়েছিল কাকতালীয়—কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা যেন নিয়মে দাঁড়িয়ে গেল।

চোখে চোখ পড়ত। কোনো কথা হতো না।
তবুও মনে হতো—অনেক কিছু বলা হয়ে গেল।

এই গল্পে আমি তার প্রকৃত নাম ব্যবহার করছি না।
ধরা যাক, তার নাম—লাবনী। এই লেখার পুরোটা জুড়ে আমি তাকে এই নামেই ডাকব।

খোঁজ নিয়ে জানলাম—ওর নাম লাবনী, ভালো পরিবারের মেয়ে।
আর আমি? এসএসসি শেষ করে ছোট একটা চাকরি করি।

ঠিক কবে, কীভাবে তাকে ভালোবেসে ফেললাম—বুঝতেই পারিনি।
শুধু একদিন হঠাৎ মনে হলো—
আমাকে ওর যোগ্য হতে হবে।

অনেকদিন বন্ধ থাকার পর আবার পড়াশোনা শুরু করলাম। কলেজে ভর্তি হলাম।
আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়—সে না থাকলে হয়তো বইয়ে আর কখনোই হাত দিতাম না।

আমার অফিসটা ছিল তার যাতায়াতের পথের পাশেই।
সকালে সে মক্তবে যেত, তারপর স্কুলে। বিকেলে নলকূপে পানি আনতে বের হতো।

আমি জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতাম।

জানালায় দাঁড়ানোটা আগে থেকেই অভ্যাস ছিল—
কিন্তু ওর কারণে সেটা অপেক্ষায় পরিণত হলো।

মৃদু পায়ে ও এগিয়ে আসতো—কখনো একা, কখনো বান্ধবীদের সাথে।
চোখাচোখি হতো। সে হালকা তাকাতো, মৃদু হেসে চোখ ফিরিয়ে নিতো।

সেই হাসি বুকের ভেতর ঠিক কী করত—তা ভাষায় বলা কঠিন।
শুধু জানি, একটা অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে দিত।

আমি চাতকের মতো তাকিয়ে থাকতাম—
যে পথে সে আসতো, যে পথে হারিয়ে যেত।

তারপর আবার অপেক্ষা…

কখনো কখনো জানালা বদলাতাম—ডান পাশ থেকে বাম পাশে।
মনে মনে ভাবতাম—সে কি আমাকে খুঁজবে?

একসময় বুঝলাম—
হ্যাঁ, ওর চোখ দুটোও আমাকে খুঁজে।

একদিন একটু অন্যরকম কিছু করলাম।

জানালায় দাঁড়ালাম না।
দোতলার বারান্দায় চলে গেলাম। একটা নারিকেল গাছের পাতার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইলাম—নিজেকে একটু লুকিয়ে রেখে।

সেদিন ও এলো।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে হেঁটে আসছিল—কিন্তু চোখ দুটো ছিল অস্থির।
একটার পর একটা জানালায় চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিল।

আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম—
সে আমাকে খুঁজছে।

ওর চোখের সেই খোঁজার ভঙ্গিটা আজও ভুলতে পারিনি।
একটা জানালা, আরেকটা জানালা—সব জানালা যেন ওকে ফিরিয়ে দিচ্ছিল শূন্যতা।

হঠাৎ ওকে খুব বিমর্ষ লাগলো।

ঠিক তখনই—তার এক বান্ধবীর সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেল।
সে ইশারায় বলল—“ঐ যে, দোতলায় দেখ।”

লাবনী থেমে গেল।

মাথা তুলে তাকালো।

আমাদের চোখ মিললো।

আর ঠিক সেই মুহূর্তে—ওর চোখেমুখে যে আলো ফুটে উঠেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
যেন হারিয়ে যাওয়া কিছু হঠাৎ ফিরে পেয়েছে।

সেই কয়েকটা সেকেন্ড—সময় যেন থেমে ছিল।

আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তবুও মনে হচ্ছিল—দূরত্বটা খুব বেশি না।

ওর চোখে অপেক্ষা ছিল, স্বস্তি ছিল—আর ছিল একরকম নীরব আনন্দ।

আমিও স্থির হয়ে গিয়েছিলাম।

মনে হচ্ছিল—সবকিছু ভেঙে, সব দূরত্ব পেরিয়ে, ওর কাছে চলে যাই।

কিন্তু বাস্তবতা তখনও নিজের জায়গায় অটল ছিল।

কয়েক সেকেন্ড পর—
ধরা পড়ে যাওয়ার লজ্জায়, মুখ নামিয়ে, বান্ধবীদের সাথে দ্রুত পায়ে মক্তবের পথে হারিয়ে গেল।

এরপর একসময় আমাদের কথা হলো।

খুব সাধারণভাবে—খুব সহজভাবে।
কিন্তু আমার কাছে—অসাধারণ।

প্রতিদিন বিকেলে দেখা হতো। কথা হতো।

একদিন—ও সেদিন কলসী কাঁখে বের হয়েছিল—
সাহস করে মনের কথাটা বলে ফেললাম।

আমি তাকে ভালোবাসি।

লজ্জা-রাঙা ওর মুখটা সেদিন বৃষ্টিস্নাত আপেলের মতো লাগছিল।
যেন মেঘভাঙা পূর্ণিমা চাঁদ লুকানোর জায়গা খুঁজছে।
যেন অচেনা কোনো আলো এসে ওর চোখমুখ ভাসিয়ে দিচ্ছে।

সে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল।

তারপর খুব আস্তে বলল—
“আমিও।”

সেদিন মনে হয়েছিল—জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না।

কিন্তু জীবন সব গল্পকে পূর্ণতা দেয় না।

লাবনী যেন আমার আকাশে দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো উঠেছিল—
তারপর খুব দ্রুতই অস্তাচলে হারিয়ে গেল।

একদিন হঠাৎ সে আসা বন্ধ করে দিল।

আমি অপেক্ষা করলাম।
একদিন, দুইদিন, তিনদিন… এক সপ্তাহ…

তারপর আর থাকতে পারলাম না। খোঁজ করতে শুরু করলাম।
অস্থির হয়ে উঠলাম।

একদিন তাকে পেলাম।

জিজ্ঞেস করলাম—“কেন আসছো না?”

সে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
খুব আস্তে বলল—
“ভাইয়া জেনে গেছে… আমাদের পরিবার মেনে নেবে না।”

আমি বললাম—“এভাবে বলো না, প্লিজ…”

সে বলল—
“ভাইয়াকে কষ্ট দিতে পারবো না।”

তার গলায় কষ্ট ছিল—
কিন্তু সিদ্ধান্তও ছিল।

তারপরও আমি থামিনি।

চেষ্টা করেছি। অনেকবার।

কখনো সামনে পড়ে গেলে বলতাম—“অন্তত কথা বলো…”
কখনো সে কথা বলত—কিন্তু সেই কথায় আর প্রাণ থাকত না।

একদিন সে বলল—
“এটা এগিয়ে নেওয়া যাবে না।”

আমি তখনও অবুঝ, নাছোড়বান্দা।

একদিন ওর বড় ভাইয়ের কাছে গেলাম।
একদিন সরাসরি ওদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম।

ওর বাবা ছিলেন না।
ওর মায়ের সাথে বিনীতভাবে কথা বললাম।

বললাম—
ওর জন্যই আমি আবার পড়াশোনা শুরু করেছি… কলেজে ভর্তি হয়েছি…

কিছুই বদলায়নি।

তারপর শুরু হলো আমার নিঃশব্দ ভেঙে পড়া।

অনেক কেঁদেছি আমি।
নীরবে, একা—সকাল, সন্ধ্যা, রাত—নামাজে দাঁড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছি।

একদিন কাঁদতে কাঁদতে অনুভব করলাম—
আমার কাঁধে একটা হাত।

চমকে তাকিয়ে দেখি—আমার অফিসের বস।

তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

সব বলতে হলো।

তিনি আমাকে আশ্বাস দিলেন—আমার হয়ে কথা বলবেন।

তারপর একদিন তিনি আমাকে অনেক বোঝালেন।
নিজের জীবনের গল্প শোনালেন।

বললেন—
“এভাবে নিজেকে শেষ করো না। লেখাপড়া চালিয়ে যাও। নিজের ক্যারিয়ার গড়ো… জীবনে এমন অনেক লাবনী আসবে।”

আজ পঁচিশ বছর কেটে গেছে।

সময় বদলেছে।
জীবন বদলেছে।
আমিও বদলেছি।

কিন্তু একটা নাম—আজও বদলায়নি।

লাবনী।

মনের মণিকোঠায় আজও সে অমলিন—
হৃদয়ের গভীরে ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করে।

আজও মাঝে মাঝে মনে হয়—
সেদিন যদি সরে না যেতাম?

আর একটু সাহসী হতাম?

আর একবার যদি তার দুয়ারে গিয়ে দাঁড়াতাম?
তার ভাইয়ের কাছে আর একবার যেতাম; বারবার যেতাম?

জানি না…

তবে একটা জিনিস জানি—
সে আমার জীবনে এসেছিল থাকার জন্য না…

আমাকে বদলে দেওয়ার জন্য।

আজও কখনো “লাবনী” নামটা বুকের ভেতর ঝড় তোলে।
দু’চোখ ভিজে যায়।

কেন হয়—জানি না।
জানতেও চাই না।

শুধু প্রার্থনা করি—
যেখানেই থাকো, ভালো থেকো… প্রেয়সী।

ভালোবাসা সবসময় ভেঙে দেয় না—
কিছু ভালোবাসা মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলে।

লাবনী ছিল আমার সেই ভালোবাসা।

Melodies of Laboni

Three songs inspired by her memory and silence

A modest young couple sitting on a small boat in a calm river, sharing a quiet romantic moment inspired by Laboni
সব ভালোবাসার হয়তো হ্যাপি এন্ডিং হয় না— কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো থেমে যায় না; হৃদয়ের গহীনে নীরবে নিভৃতে স্মৃতির বাগান হয়ে আজীবন বেঁচে থাকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *